মগবাজার থেকে বাসে উঠেছি। গন্তব্য শাহবাগ।
ড্রাইভার এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, "ভাই, বিশ মিনিট।"
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে হালকা হেসে ফেললাম।
ঢাকায় যে মানুষ বাসে উঠে "বিশ মিনিট" বিশ্বাস করে, তার জন্য আলাদা হাসপাতাল থাকা উচিত।
বাস ছাড়ল।
সাত মাস(সাত ঘন্টা) পর দেখি বাংলামোটর পর্যন্ত এসেছি।
আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এত অল্প সময়ে এতটা রাস্তা কীভাবে এলাম!
ঠিক তখনই একটা মেয়ে বাসে উঠল।
পুরো বাসে একটা সিটও খালি নেই।
শুধু আমার পাশের সিটটা আছে।
আমি মনে মনে বললাম, "আজকে মনে হয় ভাগ্য আমার প্রেম করানোর দায়িত্ব নিয়েছে।"🙂
মেয়েটা এসে ধপ করে বসে পড়ল।
আমি এতটাই নার্ভাস হয়ে গেলাম যে কন্ডাক্টর ভাড়া চাইলে নিজের বদলে পাশের লোকটার ভাড়া দিয়ে দিলাম।
কন্ডাক্টর বলল,
— ভাই, প্রেম করেন সমস্যা নাই, কিন্তু হিসাব কইরা করেন। কন্ডাক্টরের কথা কিছুই বুঝালাম না 😶,,
মেয়েটা হেসে ফেলল।
আমিও হাসলাম।
মনে হলো বরফ গলল।
...
গরমে সবার অবস্থা খারাপ।
একজন বলছে,
— এই জ্যামে আমার ছোট ভাই ক্লাস ফাইভে উঠছে।
আরেকজন বলল,
— আমি বাসে উঠছিলাম অবিবাহিত। এখন দুই সন্তানের বাবা।
সবাই হেসে উঠল।
মেয়েটাও হাসল।
আমি সুযোগ বুঝে বললাম,
— আপনি হাসলে জ্যামটা একটু কম বিরক্তিকর লাগে।🙂🙏
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এই ডায়লগ কতজনকে বলেছেন?
আমি বললাম,
— আপনিই প্রথম।
মেয়েটা বলল,
— ছেলেরা এই কথাটাও সবাইকে বলে।
আমি চুপ করে গেলাম।
কথা সত্যি।
কারণ এই ডায়লগ আমি আসলে মাথার ভেতর আরও সাতজনকে বলেছি।🙏
...
একজন হকার উঠল।
চানাচুর বিক্রি করছে।
আমি দুই প্যাকেট কিনলাম।
একটা পাশের মেয়েকে দিলাম।
ও বলল,
— ধন্যবাদ।
আমি বললাম,
— পরে সুদসহ ফেরত দিয়েন।
ও বলল,
— সুদ হারাম।
আমি বললাম,
— তাহলে মূলটাই দিয়েন।
ও আবার হেসে ফেলল।
এই মেয়েটার হাসির সমস্যা আছে।
অল্পতেই হাসে।
আর আমার সমস্যাটা হলো—
ও হাসলেই আমার মনে হয়, পৃথিবীটা খুব খারাপ জায়গা না।🐸
...
কথা বলতে বলতে জানলাম, ওর নাম নীলা।
ও জানল আমার নাম রায়হান।
আমি প্রেম নিবেদন শুরু করলাম🙂 এক পর্যায়ে প্রেম হয়ে গেল,,,
তারপর শুরু হলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
আমি বললাম,
— বিয়ে করলে গ্রামের দিকে একটা বাড়ি করব।
ও বলল,
— আমি শহর ছাড়া থাকতে পারব না।
আমি বললাম,
— ঠিক আছে, দুইটা বাড়ি।
ও বলল,
— রান্না আমি করব না।
আমি বললাম,
— আমিও না।
দুজনেই পাঁচ মিনিট চুপ।
তারপর একসাথে বললাম,
— তাহলে খাব কী?
...
বাস তিন মাস ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
বাসে,, একটা ছোট ছেলে ছিল।
সে বাসে উঠেছিল এলকেজিতে।
এখন 5 এ পড়ে।
সময়ের সাথে সাথে আমাদের সম্পর্কও বদলাতে লাগল।
একসময় আমি বলেই ফেললাম,
— নীলা...
— হুম?
— মনে হয় আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
— আমিও একটা কথা বলব?
আমার বুক ধুকপুক করছে।
— বলো।
ও বলল,
— আমিও বোধহয়...
ঠিক তখনই সামনে বসা এক চাচা চিৎকার দিল,
— ড্রাইভার! বাস এক হাত সামনে গেছে!
পুরো বাস হাততালি দিয়ে উঠল।
আমাদের রোমান্স আবার পিছিয়ে গেল।
...
আরও কয়েক মাস পর অবশেষে নীলা বলল,
— হ্যাঁ... আমারও তোমাকে ভালো লাগে।
সেদিন মনে হচ্ছিল, শাহবাগে না পৌঁছালেও চলবে।
এই বাসেই বুড়ো হয়ে যাব।🤣
...
আমরা ভবিষ্যতের সব প্ল্যান করে ফেললাম।
বিয়ে।
হানিমুন।
বাচ্চার নাম।
এমনকি বুড়ো বয়সে কে আগে মরবে, সেটা নিয়েও তর্ক হলো।🙏
...
অবশেষে একদিন জ্যাম ছাড়ল।
বাস দুর্বার গতিতে শাহবাগের দিকে ছুটছে।
আমি বললাম,
— নেমে একটা কফি খাব?
নীলা মুচকি হেসে বলল,
— অবশ্যই।
বাস থামল।
আমরা দুজন নামলাম।
আমি বললাম,
— এবার বলো, তোমার বাসায় কবে যাব?
নীলা ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করল।
আমি ভাবলাম, হয়তো ফোন নম্বর লিখে দেবে।
ও একটা পরিচয়পত্র আমার হাতে দিল।
লেখা—
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগ
গবেষণার বিষয়: দীর্ঘস্থায়ী ট্রাফিক জ্যামে অপরিচিত মানুষের আবেগগত পরিবর্তন।
আমি কিছুই বুঝলাম না।
নীলা খুব ভদ্রভাবে বলল,
— আপনি আমার গবেষণার ৪২ নম্বর অংশগ্রহণকারী।
আমি হা করে তাকিয়ে আছি।
ও নোটবুকে টিক দিল।
"Subject-42: ১৭ মাস জ্যামে আটকে থাকার পর প্রেমে পড়েছে। গবেষণা সফল।"
আমি শুকনো গলায় বললাম,
— মানে... তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
নীলা একটু বিব্রত হয়ে বলল,
— গবেষণার স্বার্থে বলেছিলাম।
আমার বুকটা হালকা ধপ করে উঠল।
ঠিক তখনই একটা সিএনজি এসে থামল।
ভেতর থেকে আরেকটা ছেলে নামল।
ছেলেটা নীলাকে দেখে বলল,
— সরি, জ্যামে আটকা ছিলাম।
নীলা হেসে বলল,
— সমস্যা নেই। আমার থিসিসও শেষ।
আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম।
ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে সহানুভূতির হাসি দিল।
বলল,
— ভাই, কিছু মনে কইরেন না।
আমি কপাল কুঁচকে বললাম,
— আপনি কে?
সে হাত বাড়িয়ে বলল,
— আমি ওর বয়ফ্রেন্ড।
আর... এই গবেষণার ৪১ নম্বর সাবজেক্ট। এবার আপনার পালা ছিল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর হেসে ফেললাম।
কারণ হঠাৎ মনে হলো এখনও যদি আমি অফিসে না যাই আমার আর রক্ষে থাকবে না 🫡।

