কলেজে যে দিন মেহেরীনের সাথে তার দেখা হয় সেদিন থেকে নিশান যেন এক নতুন মানুষ। তার সেই চুপচাপ স্বভাবটা পুরোপুরি যায়নি ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণে এখন সবসময় একটা শান্ত ঝিলিক খেলা করে। প্রতিদিন সকালে নীল শার্টটা গায়ে জড়িয়ে সে যখন বাসে উঠত, ভিড়ের মাঝেও সে এক অদ্ভুত সজীবতা অনুভব করত। দুই বছরের প্রতীক্ষার পর পাওয়া সেই হারানো আকাশটা এখন তার হাতের মুঠোয়। করিডোরের ভিড়ে এখন সে আর একা নয়; সে জানে, লাইব্রেরির কোণায় কিংবা কৃষ্ণচূড়া তলার বেঞ্চে কেউ একজন তার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে।
মেহেরীনও বদলে গেছে। আগের সেই চঞ্চল স্কুল ছাত্রীটি এখন এক ধীরস্থির তরুণী। তার প্রতিটি কথায় এক ধরণের গভীরতা, প্রতিটি হাসিতে এক গোপন অভিমান। সে এখন আর শুধু কাঠগোলাপের গল্প করে না, সে এখন ভবিষ্যতের কথা বলে। ছোট ছোট স্বপ্ন বোনে—বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, একসাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন। কিন্তু তাদের এই স্বপ্নের আকাশে মিরাজ ছিল এক কালো ছায়ার মতো, যা তারা দুজনেই অনুভব করত কিন্তু কেউ মুখ ফুটে কিছু বলত না।
ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। বসন্তের আগমনী বার্তা বাতাসে। সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা গুমোট হয়ে ছিল। কলেজের ক্লাসগুলো শেষ হতে না হতেই আকাশ ভেঙে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। অসময়ের এই বৃষ্টিতে সবাই যখন কমন রুমে কিংবা বারান্দায় ভিড় করছে, নিশান আর মেহেরীন তখন লাইব্রেরির সেই নির্জন কোণে বসে ছিল। লাইব্রেরির পুরনো বইয়ের গন্ধ আর জানালার বাইরের বৃষ্টির ঝাপটা—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা।
মেহেরীন তার ব্যাগের ভেতর থেকে একটা নীল রঙের খাম বের করল। নিশান অবাক হয়ে তাকাল। "এটা কী মেহেরীন?" নিশান মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
মেহেরীন হাসল। ওর হাসিতে আজ একটু লাজুক আভা। "এটা তোমার সেই সাদা খামের উত্তর। দুই বছর আগে যেটা দিয়েছিলে। আমি নতুন শহরে গিয়ে ওটা কতবার যে পড়েছি তার হিসেব নেই। প্রতিটি রাতে যখন একা লাগত, আমি খামটা বালিশের নিচে নিয়ে ঘুমাতাম। আজ আমার মনের জমানো সব কথা এই নীল খামে লিখে এনেছি।"
নিশান খামটা হাতে নিল। কাগজের ওপর দিয়ে হাত বোলাতেই সে মেহেরীনের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারল। সে খামটা পকেটে রেখে বলল, "বাসায় গিয়ে একান্তে পড়ব। এখানে নয়।"
মেহেরীন জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "জানো নিশান, মাঝে মাঝে আমার খুব ভয় হয়। মনে হয় এই সুখটা যদি হঠাৎ হারিয়ে যায়? এই যে আমরা পাশাপাশি বসে আছি, এই মুহূর্তটা যদি একটা স্বপ্ন হয়? খুবনিশান মেহেরীনের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। এই প্রথম সে মেহেরীনের হাত স্পর্শ করল। মেহেরীনের আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু নিশানের স্পর্শে তাতে যেন প্রাণের উষ্ণতা ফিরে এল। "স্বপ্ন হলেও আমি এই স্বপ্নটা ভাঙতে দেব না মেহেরীন। আমি আছি তো। বেশি সুখী হতে আমার ভয় লাগে।"
