নিশান প্রথমে কথা বলল। তার কণ্ঠস্বরছিল বরফের মতো শীতল।
"কালকের বিকেলটাকেমন কাটল মেহেরীন? লেকের ধারের বাতাস কি খুব মিষ্টি ছিল?"মেহেরীন আকাশ থেকে পড়ল।
"লেকের ধার? মানে? আমি তো কাল সারা বিকেল বাসায় নোট গুছিয়েছি।" নিশান একটা তাচ্ছিল্যেরহাসি হাসল।
"অভিনয়টা বেশ ভালোই শিখিয়ে দিয়েছে সে তোমাকে। আমি ভাবিনি তুমি এত বড় মিথ্যুক হতে পারো মেহেরীন।"
মেহেরীনের চোখে জল টলমল করে উঠল। অপমানে তার শরীর কাঁপছে।সে পাল্টা আঘাত করল।
"আর তুমি? তুমি যে বন্ধুদের কাছে বলো আমি তোমার কেবল একটা পুরনো জেদ? আমাকে হাসাতে পারাটাইতোমার জীবনের মিশন? সেটা কি সত্যি নিশান?" "আমি?আমি কবে বললাম?" নিশান অবাক হলো।
"মিরাজ আমাকে শুনিয়েছে তোমার কথা। আমি নিজের কানে তোমার কণ্ঠ শুনেছি! ধিক্কারজানাই তোমার এই ভালোবাসাকে!"মেহেরীন চিৎকারকরে উঠল।
নিশান চুপ হয়ে গেল। মিরাজ! আবার মিরাজ! সে বুঝতে পারল মিরাজ তাদের দুজনকে দুই প্রান্ত থেকে কামড় দিচ্ছে।কিন্তু তখন রাগ আর অভিমান এতটাই প্রবল ছিল যে, কেউ কাউকে বুঝিয়ে বলার মতো ধৈর্য ছিল না। দুজনেই ভাবল, কেউ তাদের সাথে প্রতারণা করছে।
নিশান শান্ত গলায় বলল,
"ঠিক আছে মেহেরীন। যদি অবিশ্বাসই আমাদের সম্পর্কের শেষ পরিণতি হয়, তবে আর একসাথে থেকে লাভ নেই। আজ থেকে আমরা মুক্ত।"
মেহেরীন আর কিছু বলতে পারল না। সে দেখল নিশান দ্রুত পায়ে লাইব্রেরিথেকে বের হয়ে যাচ্ছে।যে লাইব্রেরিতেতাদের গল্প নতুন করে শুরু হয়েছিল,সেখানেই আজ গল্পের একটা বিশাল অধ্যায়েরঅপমৃত্যু ঘটল।
কলেজের শেষ দিন। সবাই যখন গেটে দাঁড়িয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে,নিশান তখন পেছনের গেট দিয়ে একাই বেরিয়ে এলো।তার কাঁধের ব্যাগটা আজ খুব ভারি মনে হচ্ছে। সে একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
বাসায় ফিরে নিশান তার ডায়েরির একটি পাতায় বড় করে একটা ক্রস চিহ্ন দিল। তারপর লিখল:
"আজ আমার কলেজ জীবনেরশেষ দিন।আমি শুধুএকটা সার্টিফিকেট নিয়ে ফিরছি না,আমি নিয়েফিরছি একবিশাল অবিশ্বাসের বোঝা। মেহেরীন, তুমিহয়তো আজমিরাজের সাথেবিজয়ের হাসিহাসছ। আমিহার মেনেনিলাম। কিন্তুমনে রেখো,কাঠগোলাপের সুবাসএকসময় মিলিয়েযায়, কিন্তুতার দাগরয়ে যায়চিরকাল।"
জানালার বাইরে তখন সূর্য ডুবছে। আকাশটা রক্তিম হয়ে আছে, ঠিক যেন কারো হৃদপিণ্ড থেকে ঝরা রক্ত। নিশান জানত না, এই বিদায় কেবল একটি কলেজের বিদায় নয়, এটি তার জীবনের ধ্বংসেরপ্রথম ধাপ।