প্রেমে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়া
মানুষ যখন প্রেমে জড়িয়ে পড়ে, তখন মস্তিষ্কের ভেতরে একাধিক জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময় মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু নিউরোকেমিক্যাল ব্যাপকভাবে নিঃসৃত হয়, যার ফলে শরীর ও মনে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা যায়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, হাত ঘামা, মুখ লাল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা এবং অকারণ উৎকণ্ঠা—এসবই প্রেমের প্রাথমিক পর্যায়ের সাধারণ লক্ষণ।
রোমান্টিক প্রেমের শুরুতে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন মূলত শরীরকে মানসিক চাপ বা অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত করে। কর্টিসলের এই বৃদ্ধি মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, যা মানুষের চিন্তাভাবনাকে অতিরিক্ত ব্যস্ত ও আবেশপূর্ণ করে তোলে। এর ফলে প্রিয় মানুষকে ঘিরে বারবার চিন্তা করা, অস্থিরতা এবং একধরনের মানসিক নির্ভরতা তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অবসেসিভ আচরণের মতো প্রকাশ পায়।
প্রেমের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলোর একটি হলো ডোপামিন। প্রেমে পড়লে ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা মস্তিষ্কের পুরস্কার কেন্দ্রকে সক্রিয় করে তোলে। এই রাসায়নিকটি আনন্দ, উত্তেজনা ও তীব্র আকর্ষণের অনুভূতি সৃষ্টি করে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেমের সময় সৃষ্ট এই আনন্দের অনুভূতি মাদক বা অ্যালকোহলের কারণে সৃষ্ট উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্নায়ুবৈজ্ঞানিকভাবে মিল রাখে। অর্থাৎ, ভিন্ন উৎস হলেও একই পুরস্কার ব্যবস্থা সক্রিয় হয়।
এছাড়াও প্রেমের ক্ষেত্রে অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিন নামক দুটি হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই হরমোনগুলো মূলত সংযুক্তি, বিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। শারীরিক ঘনিষ্ঠতা ও যৌনমিলনের সময় অক্সিটোসিনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা সঙ্গীর প্রতি নিরাপত্তা ও আবেগগত ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি জোরদার করে। অন্যদিকে ভ্যাসোপ্রেসিন দীর্ঘস্থায়ী ও একগামী সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক আচরণের সঙ্গে যুক্ত। এই কারণেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আবেগপূর্ণ প্রেম কমে গেলেও সংযুক্তি ও বন্ধন আরও দৃঢ় হতে পারে।
প্রেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি মস্তিষ্কের ভয় ও সামাজিক বিচারসংক্রান্ত স্নায়ুপথকে আংশিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। প্রেমে পড়লে মানুষ সাধারণত প্রিয় ব্যক্তির ত্রুটি বা নেতিবাচক দিকগুলো উপেক্ষা করে চলে। স্নায়ুবৈজ্ঞানিকভাবে, এই সময় মস্তিষ্কের সেই অংশগুলো কম সক্রিয় থাকে যেগুলো সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ও বিচার-বিবেচনার জন্য দায়ী। এ কারণেই বলা হয়, “ভালোবাসা অন্ধ”—যার পেছনে একটি স্পষ্ট স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে।
বই: #Mind_Hackers
~রেদোয়ান আসিফ রিসান