মেহেরীনকে ছাড়া কেটে গেল প্রায় দেড়টা বছর।
এই আঠারোটি মাস নিশানের কাছে কেবল কতগুলো সংখ্যা ছিল না, ছিল এক দীর্ঘ নীরবতা। প্রতিটি দিন যখন স্কুলের করিডোর দিয়ে সে হেঁটে যেত, তার মনে হতো ঠিক পাশের জানালাটা দিয়ে মেহেরীন এইমাত্র উঁকি দিল। কিন্তু তাকালেই দেখত সেখানে কেবল রোদের ঝিলিক কিংবা ধুলোবালির ওড়াউড়ি। মেহেরীন চলে যাওয়ার পর সেই কাঠগোলাপ গাছটার নিচ দিয়ে হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছিল নিশান। ওই ঘ্রাণটা পেলেই বুকটা কেমন হু হু করে ওঠে।
আজ স্কুল জীবনের বিদায়ের দিন।
অডিটোরিয়ামে মিলাদ আর দোয়ার অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আবেগঘন কণ্ঠে বিদায়ী ভাষণ দিচ্ছেন, কিন্তু নিশানের কানে কোনো কথাই ঢুকছে না। তার কেবল মনে পড়ছে ক্লাস নাইনের সেই বৃষ্টিভেজা দিনটার কথা, যখন মেহেরীন ওর ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। আজ সেই ছাতাও নেই, সেই মানুষটাও নেই।
সবাই যখন একে অপরের সাদা ইউনিফর্মে মার্কার কলম দিয়ে লিখছে, "দোস্ত মনে রাখিস", "মিস ইউ অল"
নিশান তখন ক্লাসরুমের একদম শেষ বেঞ্চে একা বসে ছিল। ওর শার্টটা ধবধবে সাদা। কেউ সেখানে কিছু লেখেনি, কারণ নিশান কাউকে সুযোগই দেয়নি।
হঠাৎ সৌরভ এসে ওর পাশে বসল। সৌরভের শার্টে হিজিবিজি লেখায় ভরা। সৌরভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েই গেল রে নিশান। আজ থেকে আমরা আর স্কুলের ছাত্র না। কাল থেকে সবাই অন্য ঠিকানায় চলে যাব।"
নিশান জানালার বাইরে তাকিয়ে ম্লান হাসল। আর বলল-
"ঠিকানা তো মেহেরীন দেড় বছর আগেই বদলে ফেলেছে সৌরভ। আমরা তো শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য এতদিন এখানে ছিলাম।"
সৌরভ নিশানের কাঁধে হাত রাখল। "তুই কি এখনো ওর জন্য অপেক্ষা করিস? দেড় বছরে তো একটা যোগাযোগও হলো না।"
"অপেক্ষা করাটা তো আমার হাতে নেই রে বন্ধু। ওটা হৃদয়ের ব্যাপার। ও বলেছিল অপেক্ষা করতে, আমি করছি। ব্যস, এটুকুই।"
ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার সময় নিশান দেখল মিরাজ একদল বন্ধুর মাঝে দাঁড়িয়ে খুব হাসছে। মিরাজ এখন স্কুলের বড় লিডার। সে নিশানকে দেখে এগিয়ে এল। মিরাজ বাঁকা হেসে বলল, "কিরে নিশান? শার্ট তো একদম পরিষ্কার! কেউ কিছু লেখেনি? আচ্ছা চল, আমি লিখে দিই।"
নিশান সরে দাঁড়িয়ে বলল, "না থাক। কিছু সাদা জায়গা সাদাই থাক মিরাজ। সবখানে দাগ দিতে নেই।"
........
