তবুও, মন কি আর সব নিয়মকানুন বা যুক্তির ধার ধারে? মন বড় অদ্ভুত এক অবাধ্য পাখি। অজিতের জন্য এই ক্যাফেতে বসে অপেক্ষা করতে করতেও ফাবিহার অবচেতন মন মাঝে মাঝে চোখের পলকে টাইম মেশিনের মতো পেছনের দিনগুলোতে ছুটে যায়। ক্যাফের ভারী দরজাটা যখনই কারো ধাক্কায় একটু শব্দ করে খোলে, ফাবিহার বুকটা কেমন যেন ছাঁত করে ওঠে। অজিতের আসার সময় এখনো হয়নি জেনেও, তার অবাধ্য চোখ দুটো যেন আপনাআপনিই দরজার দিকে ঘুরে যায়—যদি রাহিলকে একবার দেখতে পাওয়া যায়! যদি সেই চিরচেনা ছায়াটা আবার এসে দাঁড়ায় টেবিলের পাশে!
পরক্ষণেই সম্বিৎ ফিরে পায় ফাবিহা। বুকের ভেতর জমে ওঠা ঝড়ের ধাক্কা সামলে সে দ্রুত নিজের আঙুলের চঞ্চলতা থামায়। টেবিলের ওপর রাখা চামচটা দিয়ে খালি কাপে অযথা শব্দ তোলে, আর অতীতের সেই ধূসর, অবাধ্য স্মৃতিগুলোকে দুই হাতে শক্ত করে দূরে ঠেলে দেয়। দূরে রাস্তার ট্রাফিকের হর্ন আর দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ মনে করিয়ে দেয় বর্তমানের নির্মম সত্য। ঠিক আর দশটা মিনিট পরেই অজিত গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়াবে ক্যাফের সামনে। ফাবিহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল—যে দীর্ঘশ্বাসের ভারে বর্তমানের সমস্ত সাজানো গোছানো সংসারটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। নিজেকে শতবার শক্ত করার পণ করেও ফাবিহা যেন আজও অতীতের এক অদৃশ্য মায়াজালে আটকা পড়ে আছে।
চারপাশের চেনা মুখগুলো, টেবিলে টেবিলে মানুষের হাসিমুখ আর আড্ডার শব্দ—কোনো কিছুতেই ফাবিহার মনোযোগ নেই। তার মন তখন পড়ে আছে অন্য এক সময়ে, অন্য এক সমীকরণে। রাহিলের সাথে কাটানো শেষ দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতরটায় কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। রাহিল কি সত্যিই তাকে ভুলে গেছে? নাকি সেও ফাবিহার মতো এভাবে কোনো এক ক্যাফেতে বসে হিসাব মেলায় না-হওয়া ভালোবাসার? ফাবিহা এসব ভাবতে চায় না, তবুও ভাবনাগুলো বাঁধ ভেঙে উপচে পড়তে চায় বারবার।
ফাবিহার চোখের পলক পড়তে না পড়তে ক্যাফের জানালার কাচে বাইরে থেকে একটা পরিচিত মুখ তার চোখে পড়ল। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া রিকশার বেল, দূরে কোনো বাসের হর্নের আওয়াজ আর জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক সিগন্যালের লাল আলোটা ফাবিহাকে হুশ করিয়ে দিল। এই তো অজিত আসার সময় হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা বলছে ঠিক পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। অজিতের ঘড়ির কাঁটার নিখুঁত হিসাবের সাথে কখনো এদিক-সেদিক হয় না। ফাবিহা দ্রুত নিজের হাতব্যাগ থেকে ছোট আয়নাটা বের করে নিজের মুখের ওপর একবার বুলিয়ে নিল, যেন কেউ বুঝতে না পারে একটু আগে তার মনের ভেতর কোন ঝড়ের জন্ম হয়েছিল। মুখের আলতো হাসিটাকে ঠোঁটে ফুটিয়ে তুলে সে জানালার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ক্যাফের মূল দরজার দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল অজিত। তার পরনে ছাইরঙা ফরমাল শার্ট, হাতে চামড়ার ফিতাওয়ালা একটা কালো ঘড়ি, আর কাঁধে ঝুলছে অফিসের ল্যাপটপ ব্যাগ। অজিতের মুখজুড়ে এক ধরণের ক্লান্তির ছাপ থাকলেও ফাবিহাকে দেখতে পাওয়ার সাথে সাথেই
