ঘরের কোণে ঝুলে থাকা দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা তখন বৃষ্টির পতনকে ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর ঠিক সেই শূন্যতার মাঝেই অনিকের উপস্থিতি টের পেল মেঘনা—কোনো শব্দ না করে, কেবল তার নিঃশ্বাসের ভারী বাতাসে।
"লুকোচুরি খেলছ কেন?" অনিকের ঠোঁটের কোণের সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা অন্ধকারে আরও ধারালো ঠেকলো।
মেঘনার বুকটা তখন কাঁপছে, কিন্তু সে এক ইঞ্চিও নড়ল না; কারণ সে হাড়ে হাড়ে জানত, এই মানুষটার থেকে পালানোর চেষ্টা করা মানে নিজের ধ্বংসের পথটাকে আরও কাছে টেনে নেওয়া।
অনিকের নিশ্বাসটা মেঘনার ঘাড়ের ঠিক কাছে এসে লাগতেই ঘরের ভেতরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে এল। বাইরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনো জানলার কাচে একটানা আঘাত করে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই শব্দের চেয়েও অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল অনিকের হাতের ছোঁয়া। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো জোরজুলুমের ভঙ্গি নেই—খুব ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত দক্ষতায় অনিক তার লম্বা আঙুলগুলো বাড়িয়ে দিল মেঘনার কাঁধের ওপর। এক গুচ্ছ অবাধ্য চুল কানের পাশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছলে তার আঙুলগুলো ছুঁয়ে গেল মেঘনার ত্বক। মেঘনা একটা শীতল শিহরণ টের পেল মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যেতে, কিন্তু সে একচুলও নড়ল না। সে জানত, এই মুহূর্তে একটু নড়ে ওঠা মানে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে নেওয়া, আর অনিক সেই দুর্বলতা শিকারের সুযোগ হাতছাড়া করবে না কখনো। মানুষটার শরীরী ভাষা স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল যে সে এই দূরত্বটুকু খুব উপভোগ করছে—ঠিক যেমন কোনো শিকারী তার জালে ছটফট করতে থাকা শিকারের শেষ পালানোর চেষ্টাগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখে।
"কাঁপছ কেন, মেঘনা?" অনিকের গলার স্বরটা ঠিক কানের পাতায় এসে ফিসফিসাল, যা কোনো সাধারণ মানুষের কন্ঠস্বর নয়, বরং গভীর রাতের এক দীর্ঘশ্বাস। "ভয় পাচ্ছো নাকি উত্তেজনায় বুক ফেটে আসছে, কোনটা?"
মেঘনা নিজের ভেতরের কাঁপুনিটা লুকিয়ে রাখার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রইল। সে মুখ ফিরিয়ে অনিকের চোখের দিকে তাকাতে চাইল, কিন্তু ওই চোখের গভীরে এমন এক অতল অন্ধকার টানা রয়েছে যে সেখানে তাকালে নিজের অস্তিত্বটুকু হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনিকের দৃষ্টি বড় অদ্ভুত—তাতে অন্ধ ভালোবাসা যেমন নেই, তেমনি সাধারণ কোনো ঘৃণা বা ক্ষোভও নেই; সেখানে আছে শুধুই এক সর্বগ্রাসী অধিকারবোধ, যা যেকোনো সুন্দর জিনিসকে নিজের মতো করে কুক্ষিগত করে পেষণ করতে ভালোবাসে। মেঘনা ছোটো করে একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অনিকের হাত তখনো তার কাঁধে পাথরের মতো বসে আছে। এতটুকুও নড়চড় করার উপায় নেই। মানুষটা যেন শুধু তার শরীরটাকে আটকে রাখেনি, সে মেঘনার চিন্তাভাবনা, তার ভবিষ্যৎ, তার স্বাধীন ইচ্ছা—সবকিছুর ওপর এক অদৃশ্য পাহারা বসিয়ে দিয়েছে।
"আমাকে ছাড়ো, অনিক," মেঘনার গলাটা অসম্ভব রকম নিচু শোনাল, ঠিক যেন কোনো ভাঙা কাচের টুকরো। "এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তোমার এই অতিরিক্ত অধিকার দেখানো, প্রতি মুহূর্তে আমাকে চোখে চোখে রাখা—এগুলো ভালোবাসার নামে একধরনের অসুস্থ মানসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।"
অনিকের মুখে এবার অদ্ভুত এক হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে রেগে গেল না, বরং মেঘনার এই ক্ষোভ প্রকাশের ভঙ্গিটা তাকে যেন আরও বেশি মোহিত করল। সে মেঘনার আরও একটু কাছে সরে এল, তাদের মাঝের সামান্য ফাঁকটুকুও মুছে দিয়ে। অনিকের কোটের পকেটে থাকা হাতের ছোঁয়া মেঘনার কাপড়ের সাথে ঘষা খাচ্ছিল। মানুষটা ধীরে ধীরে তার মুখটা নামিয়ে আনল মেঘনার কানের কাছাকাছি, ঠিক যেমন করে কেউ কোনো মারাত্মক রহস্যের কথা কাউকে বলে।
"ভালোবাসা শব্দটা খুব পবিত্র, তাই না?" অনিক বেশ ধীরেসুস্থে উচ্চারণ করল প্রতিটা শব্দ। "কিন্তু তুমি যেটাকে অসুস্থতা বলছো, মেঘনা, ওটাই আমার কাছে সবথেকে নিখুঁত সত্য। জগতটা খুব নিষ্ঠুর, বাইরে বের হলেই চারদিকে শুধু স্বার্থপরতা আর ধোঁকা। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি তো তোমাকে আমার এই ছায়ার নিচে একটা নিরাপদ খাঁচায় আগলে রাখতে চাইছি। যেখানে কেউ চাইলেও তোমাকে ছুঁতে পারবে না, তোমার দিকে খারাপ নজর দিতে পারবে না। এটাকে তুমি দমবন্ধ করা বলছো কেন? এটা তো সুরক্ষা, নিখাদ সুরক্ষা।"
"এই সুরক্ষার খাঁচা আমার চাই না!" মেঘনার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ আর সহ্যক্ষমতা যেন একসঙ্গে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। সে এবার শক্ত করে অনিকের হাত দুটো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। "তোমার এই খাঁচার চেয়ে বাইরের ওই নিষ্ঠুর জগতটা অনেক বেশি ভালো, অন্তত সেখানে নিজের স্বাধীনমতো শ্বাস তো নেওয়া যায়! তুমি আমাকে ভালোবাসো না, অনিক। তুমি ভালোবাসো শুধু নিজের জেদটাকে, নিজের নিয়ন্ত্রণটাকে। তুমি চাও আমি তোমার ইশারায় চলি, তুমি যেভাবে নাচাবে আমি সেভাবে নাচি। কিন্তু আমি কোনো পুতুল নই!"
চিৎকার করার চেষ্টা করলেও মেঘনার গলার আওয়াজটা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই আটকে গেল, বাইরে বের হতে পারল না। আর অনিকের মুখে সেই একই শীতল প্রশান্তি। সে মেঘনার বাঁধনহারা ক্ষোভটাকে খুব উপভোগ করছিল। একটা মানুষ যখন পুরোপুরি অসহায় হয়ে নিজের রাগ প্রকাশ করে, তখন তার ভেতরের আসল রূপটা বেরিয়ে আসে—অনিক ঠিক সেই রূপটাই দেখতে ভালোবাসে। সে হঠাৎ করেই তার হাত দুটো দিয়ে মেঘনার কোমর জড়িয়ে ধরে এক টানে একেবারে নিজের বুকের সাথে সেঁটে ফেলল। এত শক্ত আর আচমকা সেই টান যে মেঘনার মুখ থেকে একটা মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তাদের বুকের স্পন্দনগুলো তখন এত কাছাকাছি যে কে কারটা টের পাচ্ছে, তা আলাদা করা অসম্ভব।
"পুতুল তো খারাপ নয়, মেঘনা," অনিকের ফিসফিসানিটা এবার মেঘনার ঠোঁটের ঠিক ওপরে গিয়ে ঠেকল। তাদের নিশ্বাসগুলো একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। "পুতুলদের কোনো নিজস্ব কষ্ট থাকে না, তাদের কোনো অতীত বা ভুলের বোঝা টানতে হয় না। তারা কেবল তাদের মালিকের ইচ্ছায় বাঁচে। আর বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে আমার জীবনের সবথেকে মূল্যবান পুতুল করে রাখতে চাই। এমন এক সিংহাসনে বসাতে চাই, যেখান থেকে তুমি শুধু আমাকে দেখবে, আর কেউ নয়।"
মেঘনার চোখ দুটো দিয়ে তখন রাগে এবং অপমানে জল উপচে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সে অনিকের বুকের ওপর নিজের হাত দুটো রেখে আপ্রাণ ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু অনিকের পেশীবহুল শরীরের বিপরীতে তার সেই ধাক্কা কোনো কাজেই এল না। মনে হলো সে দেয়ালের গায়ে
