জানি তুই কষ্ট পাবি, কিন্তু সত্যটা লুকানো ঠিক হবে না রে দোস্ত।" নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। "কী হয়েছে মিরাজ? আবার কী ধাঁধা শুরু করেছিস?"
মিরাজ পকেট থেকে তার দামি স্মার্টফোনটা বের করে নিশানের সামনে ধরল। সেখানে একটি ঝাপসা ছবি। গোধূলি বেলার আবছা অন্ধকারে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে রিকশায় বসে আছে। মেয়েটির মুখ পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার পরনের ওড়নার রঙ আর চুলের সেই বিশেষ ক্লিপটা ঠিক মেহেরীনের মতো। মিরাজ নিচু স্বরে বিষ ঢালল, "কাল বিকেলে যখন তুই লাইব্রেরিতে ছিলি, তখন মেহেরীনকে দেখলাম ধানমণ্ডি লেকের ওপাশে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি, কিন্তু পরে মেহেরীনের হাসি শুনে নিশ্চিত হলাম। সাথে ছেলেটা কে জানিস? আমাদের ওই ইশতিয়াক ভাই।"
নিশানের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। তার হাত কাঁপছে। ভেতর থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইল— 'না, এটা মেহেরীন নয়!' কিন্তু তার অবচেতন মন কু গাইতে শুরু করল। দুই বছর দূরে থাকার পর মেহেরীন কি বদলে গেছে? "তুই এটা নিজের চোখে দেখেছিস?" নিশান রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল। "হ্যাঁ রে দোস্ত। আমি চাইনি তুই জানিস, কিন্তু মেহেরীন তোকে ধোঁকা দিচ্ছে। ও আসলে তোকে শুধু ব্যবহার করছে নিজের একাকীত্ব কাটাতে," মিরাজ খুব দরদি গলায় নিশানের কাঁধে হাত রাখল।
নিশান কিছুই বলল না। সে ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল। তার চোখের সামনে তখন সব অন্ধকার। সে ভুলে গেল যে আধুনিক প্রযুক্তিতে ছবি এডিট করা কত সহজ। তার মন তখন অভিমানে আর অপমানে জ্বলছে।
অন্যদিকে, মিরাজ একই সময় মেহেরীনকেও এক বিষাক্ত গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। সে মেহেরীনকে একটি অডিও ক্লিপ শুনিয়েছে—যেখানে নিশানের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ক্লিপটিতে নিশান বলছে, "মেহেরীন তো শুধু আমার পুরনো স্কুলের জেদ। ও যখন চলে গিয়েছিল, তখন হার মেনেছিলাম। এখন ওকে হাসাতে পারাটাই আমার বড় জয়। সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই।"
মেহেরীন পাথর হয়ে গিয়েছিল সেই শব্দগুলো শুনে। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না নিশান, যে তার জন্য দুই বছর অপেক্ষা করেছে, সে অন্য বন্ধুদের আড্ডায় তাকে নিয়ে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারে। মেহেরীন জানত না, মিরাজ কত নিখুঁতভাবে নিশানের কণ্ঠ নকল করতে পারে।
মেহেরীন সেদিন সারারাত একা নিজের ঘরে ডায়েরি বুকে নিয়ে কেঁদেছিল। সে ভাবল, হয়তো নিশান সত্যিই তাকে করুণা করছে। হয়তো সেই দুই বছরের অপেক্ষা ছিল কেবলই একটা পুরুষালি অহংকার টিকিয়ে রাখার লড়াই।
টেস্ট পরীক্ষার পর কলেজের বিদায় সংবর্ধনা। সবাই রঙিন জামাকাপড় পরে এসেছে, চারদিকে হাসাহাসি আর ছবি তোলার ধুম। নিশান আর মেহেরীন মুখোমুখি হলো লাইব্রেরির সেই পুরনো কোণায়, যেখানে তাদের পুনর্মিলন হয়েছিল। কিন্তু আজ পরিবেশটা লাইব্রেরির পুরনো উইপোকা ধরা বইয়ের মতো নিস্তব্ধ।
