সেদিন ছিল ১৩ই সেপ্টেম্বর। আমার খুব প্রিয় একটা তারিখ। আকাশটা সকাল থেকেই গোমড়া হয়ে ছিল, ঠিক যেমনটা আমি পছন্দ করি। আমি তখনো সেই 'মায়াকানন' নামের অভিশপ্ত বাড়িটাতে আসিনি। আমি থাকতাম শহরের এক কোণে ছোট একটা ভাড়াবাড়িতে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আর আমি—আমাদের ছোট সংসার। মা বলতেন, "মিথিলা, তুই যখন হাসিস, তখন মনে হয় আমাদের অভাবের সংসারেও বুঝি পূর্ণিমা নেমেছে।" সেদিন বিকেলে একটা নীল রঙের জামদানি পরেছিলাম। নীল আমার খুব প্রিয় রঙ। লোকে বলে, নীল নাকি কষ্টের রং। সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের কাজলের দিকে তাকিয়ে আমি প্রথমবার অনুভব করেছিলাম—আজ কিছু একটা হবে। আয়নায় দেখা সেই মুখটা কি সত্যিই আমার ছিল! নাকি ওটা ছিল কোনো এক ট্র্যাজেডির প্রথম পাতা! আমি বেরোলাম লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে। বৃষ্টি নামবে নামবে করছে। রাস্তার ধারের কাঠগোলাপ গাছগুলো থেকে দু-একটা ফুল ঝরে পড়ছে বৃষ্টির আগাম বার্তায়। আমি একটা ফুল তুলে চুলে গুঁজলাম। ঠিক তখনই রাস্তার ওপার থেকে সৌরভ আমার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল। মিথিলা শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে একবার ভিজিয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। ওর গলার স্বর এতটাই ভেঙে গেছে যে মনে হচ্ছে প্রতিটি শব্দ বের হতে গিয়ে ভেতরে কোথাও চিরে যাচ্ছে। ও শ্রাবণের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল— "শ্রাবণ বাবু, আমি একটু পানি খাবো। শ্রাবণ দ্রুত নিজের টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা এনে দিল। মিথিলার হাত কাঁপছে, হাতকড়ার শব্দটা সেই নিস্তব্ধ ঘরে বিচ্ছিরি ভাবে বাজল। কয়েক ঢোক পানি গিলে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে ও এক অদ্ভুত মায়াবী হাসি হাসল। নীল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে। ও আবার বলতে শুরু করল, "আমি জানি আপনি কী ভাবছেন। ভাবছেন তো—আজকের এই বীভৎস খুনের সাথে সৌরভের কী সম্পর্ক? কেন একটা সাজানো সংসার বিষাদে নীল হয়ে গেল?" মিথিলা একটু থামল, যেন ও দূর অতীতের কোনো এক ধূসর অতল গহ্বরে ডুব দিচ্ছে। "সৌরভ... মানুষটা আমার আকাশ হতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আমার কবরের ওপর জন্মানো এক আগাছা হয়েই রয়ে গেল। নথিপত্রে খুনের মোটিভ খুঁজছেন? ওতে পাবেন না। মোটিভ লুকিয়ে আছে আমার সেই দিনগুলোতে, যখন আমি প্রতি রাতে একটু একটু করে মরেছি আর সৌরভকে খুঁজেছি।" সম্পর্ক নেই, আবার সবটাই তাকে ঘিরে। সৌরভ আমার স্কুল এর বন্ধু। একদিন বিকেলে হঠাৎ সৌরভের সাথে দেখা, সৌরভ একটা পাঞ্জাবি পরেছিল, কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ। সে লেখক হতে চেয়েছিল। আমাকে দেখে সে এমনভাবে তাকিয়ে রইল যে মনে হলো সে কোনো মানুষ নয়, বরং জীবন্ত কোনো পরী দেখছে। সে এগিয়ে এসে খুব অদ্ভুত একটা কথা বলল।
নীলপদ্মের ব্যবচ্ছেদ (03)
সম্পর্কিত লেখা
আমি তোমাকে ভালোবাসি বলিয়াই তুমি সুন্দর
আটাশতম_শ্রাবণ (১১)
আটাশতম_শ্রাবণ (0৮)
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।