বিকেলের নরম রোদটা ক্যাফের বড় কাঁচের জানালা পেরিয়ে সরাসরি এসে পড়ল ফাবিহার সামনে রাখা খালি চায়ের কাপটার ওপর। শহরের বুকে এই ক্যাফেটার একটা নিজস্ব বয়স আছে, আছে একটা অদ্ভুত মায়া। এর কোণাকুচির এই টেবিলটার গন্ধ ফাবিহার মুখস্থ। বসার জায়গাটা একচুলও বদলায়নি—সেই একই কাঠের টেবিল, একটু খসখসে দেয়াল, আর ফ্যানের মৃদু ভনভন শব্দ। ক্যাফের ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজছে রবীন্দ্রসংগীত “তোমার খোলা হাওয়া” যেন হুবহু মিলে যায় অতীতের কোনো এক বিকেলের সাথে।
ঠিক এই টেবিলটাতে বসেই ফাবিহা একসময় কাটিয়ে দিয়েছে তার জীবনের কত শত প্রহর। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে প্রতিটা মিনিট গোনা, দরজার পাল্লা কাঁপিয়ে কার প্রবেশ ঘটছে সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা—‘এই বুঝি রাহিল এল!’—এমন এক তীব্র প্রতীক্ষার নেশায় ফাবিহার বুক সবসময় আনচান করত। রাহিলের গায়ের সেই পরিচিত গন্ধ, তার একটু দেরি করে আসার হাজারটা অজুহাত আর মুচকি হাসি—সবকিছু ফাবিহার হৃদয়ের গভীরে খুব যত্নে খোদাই করা ছিল। রাহিলকে কেন্দ্র করেই যেন আবর্তিত হতো ফাবিহার গোটা পৃথিবীটা। সে বিশ্বাস করত, এই পৃথিবীর সব নিয়ম বদলে যেতে পারে, কিন্তু রাহিলের হাত ধরে তার পথ চলা কখনো থামবে না। রাহিলের একটা ছোটো স্পর্শে ফাবিহার সমস্ত মন খারাপ নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যেত।
কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না। সময়ের নির্মম স্রোতে আজ সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। টেবিলটা ঠিক আগের মতোই আছে বটে, কিন্তু ফাবিহা নামের মেয়েটা আজ আর সেই আগের জায়গায় নেই। তার নামের শেষ অংশটুকু বদলে গেছে, বদলে গেছে তার পরিচয়ও। ফাবিহা এখন আর কারো দূর সম্পর্কের উদাসীন প্রেমিকা নয়—সে এখন পুরোপুরি সংসারী , অজিতের স্ত্রী। অজিত মানুষটা মন্দের ভালো নয়, বরং সমাজের হিসেবে বেশ চমৎকার। সে ভীষণ গুছিয়ে কথা বলতে জানে, ফাবিহার ছোটোখাটো পছন্দ-অপছন্দের নিখুঁত হিসাব রাখে। ফাবিহার সামান্য মাথা ব্যথা করলে অজিতের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। নিয়ম করে অফিস করা, ছুটির দিনে ফাবিহার পছন্দমতো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া—সংসারের চাকাটা অজিত খুব সুন্দরভাবেই টেনে নিয়ে চলেছে। ফাবিহা নিজেকে বহুবার বুঝিয়েছে, জীবন তো কোনো রূপকথা নয় যে রূপকথার রাজপুত্রের জন্যই অপেক্ষা করতে হবে। সমাজ আছে, পরিবার আছে, বাস্তবতার কঠোর নিয়ম আছে। এই সমস্ত হিসাব মিলিয়েই তো ফাবিহা এখন অজিতের ছায়ায় নিরাপদে আছে। রাহিলকে ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম, তাই না? যে সম্পর্ক মাঝপথে এসেই দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে, তাকে টেনেহিঁচড়ে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে তো কোনো বোকামি ছাড়া আর কোনো সার্থকতা নেই।
