তাদের মাঝে বন্ধুত্বটা গত কয়েক মাসে গভীর হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মেহেরীন কখনো আলাদা করে এভাবে কথা বলার প্রস্তাব দেয়নি।
নিশান লক্ষ্য করল, কাঠগোলাপ গাছ থেকে আরও একটি ফুল টুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। বসন্তের শেষ বিকেলগুলো কেন জানি খুব বেশি হাহাকারময় হয়। স্কুল ছুটির ঘণ্টা পড়ল। 'টন-টন' শব্দটা আজ নিশানের কানে অন্যরকম এক সুর নিয়ে এল। সবাই যখন ব্যাগ গুছিয়ে হৈ-হৈ করে বের হয়ে যাচ্ছে, নিশান তখন ধীরপায়ে এগোলো স্কুল গেটের দিকে।
পুরনো বটগাছটার নিচে মেহেরীন দাঁড়িয়ে ছিল। পড়ন্ত রোদের একটা ফালি ওর মুখে এসে পড়েছে। নিশানকে দেখে ও একটু এগিয়ে এল।
মেহেরীন বলল, "আমি ভাবলাম তুমি বুঝি আসবে না।"
নিশান ম্লান হেসে বলল, "তুমি বললে আর আমি আসব না, এমন কি কখনো হয়েছে? কী যেন বলবে বলছিলে?"
মেহেরীন কিছুক্ষণ নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, "বাবা বদলি হয়ে যাচ্ছেন। হয়তো এই মাসটাই আমাদের এই স্কুলে শেষ মাস।"
নিশানের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "চলে যাবে? কোথায়?"
"অন্য শহরে। অনেক দূরে।" মেহেরীনের গলায় এক ধরণের বিষণ্ণতা। "আমার খুব ভয় করছে নিশান। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ... আমি কি এই স্কুলের দিনগুলো ভুলতে পারব? আমি কি তোমাকে ভুলতে পারব?"
নিশান কিছু বলতে পারল না। তার গলার কাছে কী একটা দলা পাকিয়ে এল। সে শুধু দেখল, মেহেরীনের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে। মেহেরীন ওর হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে ঝটপট কিছু একটা লিখল, তারপর ডায়েরিটা ফেরত দিয়ে বলল, "বাড়ি গিয়ে পড়বে। এখন না।"
মেহেরীন চলে গেল। নিশান ডায়েরিটা হাতে নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। মেহেরীন চলে যাওয়ার পথেও যেন সেই কাঠগোলাপের সুবাসটুকু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
বাসায় ফিরতে রাত হলো নিশানের কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরিটা খুলল। মেহেরীন লিখেছে:
"নিশান, দূরত্ব কি কখনো স্মৃতি মুছে দিতে পারে? যদি আমাদের দেখা আর না হয়, তবে এই কাঠগোলাপের ঘ্রাণে আমাকে খুঁজে নিও। তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে?"
নিশান জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "অপেক্ষা? আমি তোমার জন্য অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকতে পারি মেহেরীন।"
........
....
