27 October 2026
উপন্যাস

আটাশতম_শ্রাবণ (06)

রেদোয়ান আসিফ রিসান · প্রকাশ: 10 Sep 2026 · আপডেট: 27 Oct 2026 · 1 মিনিট পড়া · 81 ভিউ

বদলি হওয়ার পর আমি জেদ ধরে এই কলেজেই ভর্তি হয়েছি, শুধু তোমার জন্য।"

নিশানের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। সে ভেবেছিল মেহেরীন হয়তো নতুন শহরে গিয়ে নতুন বন্ধু খুঁজে নিয়েছে, কিন্তু মেয়েটি তার জন্য অপেক্ষা করছিল! তার জন্য লড়াই করে ফিরে এসেছে।

"চলো, বাইরে যাই," মেহেরীন চোখের জল আড়াল করে বলল। "লাইব্রেরিতে কথা বলা বারণ। আমাদের অনেক কথা জমানো আছে নিশান। দুই বছরের এক বিশাল পাহাড়।"

তারা কলেজের পেছনের সেই পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গিয়ে বসল। শীতের সকালে ঝরা পাতার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় মুড়মুড় শব্দ হচ্ছিল। মেহেরীন বলল তার সেই অন্য শহরের নিঃসঙ্গ দিনগুলোর কথা। নতুন মানুষ, যান্ত্রিক পরিবেশ আর বাবার কড়া শাসনের মাঝে সে কীভাবে প্রতিদিন নিশানের সাথে কাটানো স্কুলের দিনগুলো মনে করত।

মেহেরীন বলল, জানো নিশান, যখনই একা লাগত, আমি চোখ বন্ধ করলেই সেই কাঠগোলাপ গাছটার নিচে তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। আমার খুব ভয় হতো, যদি তুমি আমায় ভুলে গিয়ে অন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব করো।

নিশান মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, "ভুলে যাওয়াটা তো সহজ ছিল মেহেরীন। কিন্তু আমি কেন যেন কঠিন পথটাই বেছে নিয়েছিলাম। আমি প্রতিদিন স্কুলে সেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম, যেখানে তুমি বসতে। লোকে ভাবত আমি পাগল, কিন্তু আমি আসলে তোমার রেখে যাওয়া সুবাসটুকু পাহারা দিতাম।"

ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে দাঁড়াল মিরাজ। মিরাজও এই কলেজে ভর্তি হয়েছে এবং সে গত কয়েক মাস নিশানের পিছনে ছায়ার মতো ছিল। তাকে দেখে মেহেরীনের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মিরাজ খুব স্বাভাবিকভাবে হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে এক ধরণের শীতলতা ছিল।

"আরে নিশান! আর এখানে মেহেরীনও? বাহ্! স্কুল জীবনের সেই পুরনো জোড়াটা তাহলে আবার মিলেই গেল!" মিরাজের গলায় কেমন যেন এক বিদ্রূপের সুর।

নিশান উঠে দাঁড়াল। "হ্যাঁ মিরাজ। মেহেরীনের সাথে আজই প্রথম দেখা কলেজে।"

মিরাজ মেহেরীনের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত স্থির দৃষ্টিতে হাসল। "কেমন আছো মেহেরীন? অনেকদিন পর দেখা। তোমাকে তো আগের থেকে আরও সুন্দর লাগছে। নিশান তো বড্ড লাকি। ওর ভাগ্যে সবসময় সেরা জিনিসটাই জোটে।"

মিরাজ চলে যাওয়ার সময় মেহেরীনের দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। নিশান সেটা খেয়াল করল না, কিন্তু মেহেরীনের মনটা কেন জানি কু গাইতে শুরু করল। সে অনুভব করল, এই নতুন করে ফিরে পাওয়াটা যতটা আনন্দের, তার আড়ালে কোনো এক ষড়যন্ত্রের ছায়া নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে।

সূর্যটা মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। বিকেলের রোদে কৃষ্ণচূড়ার শুকনো ডালগুলো কাঁপছে। নিশান আর মেহেরীন পাশাপাশি বসে আছে। তাদের মাঝে দুই বছরের দূরত্ব এখন ঘুচে গেছে ঠিকই, কিন্তু সামনে যে এক বিশাল ঝড়, সেটা তারা কেউই তখন আঁচ করতে পারেনি।

মেহেরীন তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্লাস্টিকের কৌটা বের করল। তার ভেতরে একটা শুকিয়ে যাওয়া কালচে রঙের ফুল।

"মনে আছে এটা?" মেহেরীন জিজ্ঞেস করল।

নিশান অবাক হয়ে দেখল, এটা সেই কাঠগোলাপ যেটা সে মেহেরীনকে চলে যাওয়ার দিন দিয়েছিল। দুই বছর মেহেরীন ওটা কলিজার মতো আগলে রেখেছে।

নিশান আস্তে আস্তে বলল, "এটা এখনো রেখেছ?"

"রাখব না কেন?" মেহেরীন নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল। "যেটা যতন করে রাখা হয়, সেটা কখনো নষ্ট হয় না নিশান। আমাদের সমনিশান সেদিন সন্ধ্যা"আজ আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। আমি আমার হারিয়ে যাওয়া আকাশটা ফিরে পেয়েছি। কিন্তু সেই আকাশের কোণে আজ আমি একটা কালো মেঘও দেখতে পাচ্ছি। মিরাজের হাসিটা কেন জানি আজ বিষাক্ত মনে হলো। মেহেরীন, তুমি ফিরে এসেছ— এটাই এখন আমার একমাত্র ধ্রুব সত্য। বাকি সব আমি সামলে নেব।"

 

য় বাসায় ফেরার পথে ডায়েরিতে লিখল:


্পর্কটাও তেমনই থাকবে। সারাজীবন।"

সম্পর্কিত লেখা

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

একটি মন্তব্য লিখুন