থানার দেয়ালঘড়িতে রাত তিনটা বাজার শব্দটা এই নিস্তব্ধতায় কোনো কামানের গোলার মতো শোনাল। ইন্টারোগেশন রুমের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে নোনা ধরা চুন খসে পড়ছে, ঠিক যেন কোনো পুরনো ক্ষতের আবরণ। মাথার ওপর ঝুলে থাকা একমাত্র নগ্ন বাল্বটি দুলছে, আর তার হলদেটে আলোয় মিথিলার শরীরের দাগ গুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠছে।
একটু আগেই একজন মহিলা কনস্টেবলের ভারী লাঠির মার খেয়ে ওর দেহটা একদিকে ঝুলে পড়েছে। সেই মারের দাগগুলো ওর ফর্সা চামড়ায় গাঢ় নীল হয়ে ফুটে উঠেছে—ঠিক যেন শ্বেতপাথরের গায়ে বিষাক্ত নীলপদ্ম। ওর আলুথালু চুলগুলো ঘাম আর রক্তে মিশে কপালে লেপ্টে আছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই বিধ্বস্ত অবস্থাতেও ওর ভেতর এক মায়াবী সৌন্দর্য খেলা করছে। সেই সৌন্দর্য কোনো মানুষের নয়, বরং এক প্রাচীনশ্রাবণ টেবিলের ওপাশে বসে একদৃষ্টিতে দেখছিল সামনে বসে থাকা মেয়েটিকে। সে শহরের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার বহু অপরাধীর চোখে চোখ রেখে সে সত্য বের করে এনেছে, কিন্তু আজ তার কলম চলছে না। তার সামনে বসে আছে এক 'খুনি'—অন্তত পুলিশের নথিপত্র আর হাতের হাতকড়া তাই বলছে।
শ্রাবণ ইশারায় কনস্টেবলকে থামিয়ে দিল। ঘর থেকে কনস্টেবল বেরিয়ে যাওয়ার পর নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। শ্রাবণ দেখল, মিথিলার ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তটুকু শুকিয়ে গেছে। আপনি কি আসলেই খুন করেছেন?
মিথিলা মাথা নিচু করে বসে আছে। তার লম্বা কালো চুলের অবাধ্য গোছাগুলো মুখ ঢেকে রেখেছে, কিন্তু সেই আড়াল চিরেও তার সৌন্দর্যের আভা ঠিকরে বেরোচ্ছে। তার গায়ের রং এখন ফ্যাকাশে দেখলেও বোঝা যায়, এটি একসময় আগুনের মতো উজ্জ্বল ছিল। তার ডাগর চোখের কোলগুলো এখন জমানো কান্নায় লাল হয়ে আছে। সাদা কামিজের হাতায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। এই রক্তমাখা পোশাকেও মিথিলাকে এতটাই অপার্থিব সুন্দর লাগছে যে, যে কেউ তাকে দেবীর আসনে বসিয়ে দিতে চাইবে—কিন্তু তার কপালের সেই নীল শিরার কম্পন বলে দিচ্ছে, ভেতরে ভেতরে সে কত বড় এক ধ্বংসস্তূপ বয়ে বেড়াচ্ছে।
শ্রাবণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলল, "মিথিলা, আপনার হাতে এই হাতকড়াটা আমার সহ্য হচ্ছে না। আপনি একবার বলুন যে আপনি এটা করোনি। তবে আমি চেষ্টা করবো ছেড়ে দেয়ার।"
মিথিলা ধীর ধীরে মাথা তুলল। শ্রাবণ স্তব্ধ হয়ে গেল। মিথিলার চোখের মণি দুটো যেন কাঁচের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু তার ভেতর কোনো প্রাণ নেই। সে এক ম্লান হাসি হাসল—যে হাসি দেখলে মনে হয় হৃদপিণ্ডটা কেউ খামচে ধরেছে।
