26 October 2026
উপন্যাস

নীলপদ্মের ব্যবচ্ছেদ (02)

রেদোয়ান আসিফ রিসান · প্রকাশ: 11 Sep 2026 · আপডেট: 26 Oct 2026 · 1 মিনিট পড়া · 63 ভিউ

নীলপদ্মের ব্যবচ্ছেদ (02)

"মুক্তি?"

মিথিলার কণ্ঠস্বর যেন অনেক দূর থেকে আসা কোনো বাঁশির সুরের মতো শোনাল। "শ্রাবণ বাবু, যে মেয়েটা চার বছর আগেই নিজের আত্মাকে কবর দিয়ে এসেছে, তাকে এই লোহার গরাদে আটকে রাখা কি সম্ভব? আমি তো জ্যান্ত লাশের মতো ঘুরে বেরিয়েছি এতকাল। আজ শুধু সেই লাশের গায়ে রক্তের ছিটে লেগেছে।"

শ্রাবণ টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসের পানিটা মিথিলার দিকে এগিয়ে দিল। মিথিলা পানি স্পর্শ করল না। তার বদলে সে নিজের হাতকড়া পরা হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখল। লোহার সাথে লোহার ঘর্ষণে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হলো।

মিথিলা মাথাটা একটু তুলল। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা রক্ত আর চোখের নোনা জল মিলেমিশে একাকার। ও বলতে শুরু করল, "আপনি আমার ফাইল দেখছেন অফিসার? সেখানে কিছু তারিখ আর জবানবন্দি পাবেন। কিন্তু আমার কলিজার ভেতর গত চার বছর ধরে যে আগুন জ্বলেছে, তার খবর তো কোনো ফাইলে নেই।"

ওর কণ্ঠস্বর একদম নিচু, কিন্তু তাতে যেন এক হিমশীতল পাথর চাপা দেয়া দীর্ঘশ্বাস। ও আবার বলল, "সবাই আমার রূপের প্রশংসা করে, আমার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়—কিন্তু কেউ কি আমার ভেতরের সেই কিশোরী মেয়েটিকে দেখেছিল, যে রোজ রাতে নিজের হাতে নিজের কবর খুঁড়ত? যে দিনের পর দিন এক অদ্ভুত অন্ধকারের সাথে ঘর করেছে? এই যে নীল হয়ে যাওয়া দাগগুলো দেখছেন, এগুলো তো শরীরের চামড়ায়—আমার আত্মার নীল হয়ে যাওয়া দাগগুলো কি এই ফাইল দেখে বুঝবেন আপনি?"

বাইরে তখন হঠাৎ আবার বৃষ্টি নামল। বাতাসের ঝাপটায় ইন্টারোগেশন রুমের জানলাটা সশব্দে খুলে গেল। এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির ছাঁট মিথিলার মুখে এসে লাগল। সে চোখ বন্ধ করে সেই শীতলতা অনুভব করল।

"জানেন শ্রাবণ বাবু, ঠিক এই রকম এক বৃষ্টির রাতে চার বছর আগে সে আমাকে বলেছিল—'মিথিলা, তোমার চোখ দুটো এত সুন্দর যে ওখানে তাকালে আমার মরতে ইচ্ছে করে।' আমি তখন হাসতাম। জানতাম না, কারো চোখের মায়া সত্যিই মৃত্যুর কারণ হতে পারে।"

শ্রাবণ খাতা কলম সরিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল। মিথিলা জানলার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "সেদিন আকাশটা ঠিক আজকের মতোই মেঘলা ছিলো। আমি একটা নীল শাড়ি পরেছিলাম... সেই নীল রঙের গভীরতা আজ আমার পুরো জীবনটাকে নীল করে দিয়েছে।"

থানার সেই নিস্তব্ধ ঘরটাতে মিথিলার কণ্ঠস্বরটা যেন এক পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো বাজতে লাগল। শ্রাবণ নিথর হয়ে বসে শুনছে। মিথিলার দু-চোখ এখন ইন্টারোগেশন রুমের দেয়ালে নেই, সে যেন দেয়াল ভেদ করে চলে গেছে চার বছর আগে।

শ্রাবণ বাবু, চার বছর সময়টা খুব ছোট মনে হয় না? কিন্তু যখন প্রতিটি মুহূর্ত বুকের ভেতর তলোয়ারের মতো বিঁধে থাকে, তখন চার বছর মানে চারশো শতাব্দী।


সম্পর্কিত লেখা

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

একটি মন্তব্য লিখুন