সেই ক্লান্তিকে ছাপিয়ে একটা স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। অজিত সোজা হেঁটে এসে ফাবিহার মুখোমুখি বসল। বসার আগেই ডান হাত দিয়ে ফাবিহার মাথার চুলগুলো একটু ঠিক করে দিয়ে বলল, "অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম নাকি, ফাবিহা? অফিসে আজ ফাইন্যান্সিয়াল মিটিংয়ের কারণে একটু এক্সট্রা সময় লেগে গেল।"
ফাবিহা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল, "না, এই তো মাত্র এলাম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি।"
অজিত টেবিলের ওপর রাখা মেন্যু কার্ডটা হাতে তুলে নিয়ে ইশারায় ওয়েটারকে ডাকল। ফাবিহা চুপচাপ তাকিয়ে রইল অজিতের দিকে। ফাবিহার ছোটোখাটো ভালোলাগা, তার পছন্দের ফ্লেভারের কফি, কোন রেস্টুরেন্টের খাবার তার বেশি পছন্দ—সবকিছুর একটা ছোট্ট নোটবুক যেন অজিতের মাথার ভেতরে সবসময় আপডেট থাকে। ফাবিহার বাবা-মা এই সম্বন্ধ যখন নিয়ে এসেছিলেন, তখন ফাবিহা প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিল। এত দ্রুত জীবনের রঙ এভাবে বদলে যাবে, সে কি আদৌ মানিয়ে নিতে পারবে? কিন্তু গত কয়েক মাসের সংসারী জীবনে অজিত তাকে এতটুকু অভিযোগ করার সুযোগ দেয়নি। তবুও—তবুও কেন যেন মনের গভীরে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার থেকে যায়। যে শূন্যতা অজিতের সমস্ত যত্ন দিয়েও পুরোপুরি ভরাট হয় না, সেই শূন্যতার নামই কি তবে রাহিল?
অজিত কফি অর্ডার করে ফাবিহার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী ভাবছো এত মন দিয়ে? শরীর ঠিক আছে তো?"
ফাবিহা চমকে উঠে নিজেকে সামলে নিল। একটা স্বস্তি ফুটিয়ে বলল, "না তো, কিছু না! এমনি ভাবছিলাম আজ রাতে বাসায় কী রান্না করা যায়।"
"রান্না আবার কী করা যায়! আজ তো তোমার ইচ্ছে হলে বাইরেই ডিনার সেরে নেব, নয়তো কোনো ভালো রেস্তোরাঁ থেকে পার্সেল নিয়ে নেব। সারাদিন তো বাড়িতে একা একা বোর হও, একটু বাইরে সময় কাটানো ভালো," অজিত আশ্বস্ত করার সুরে বলল।
ফাবিহা আর কথা বাড়াল না। সে শুধু চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিল। অজিতের এই নিরন্তর যত্নশীল আচরণ ফাবিহাকে কৃতজ্ঞ করে তোলে, আবার মাঝে মাঝে অপরাধবোধেও ভোগায়। যে মানুষটা তাকে এতটুকু আঁচড়ও লাগাতে চায় না, তার পাশে বসে অন্য কারো কথা ভাবা কি পাপ নয়? ফাবিহা নিজের মনকে কড়া শাসন করে। সে অজিতের সাথে কথা বলতে শুরু করে, আজকের অফিসের নানা গল্প শোনে, হাসিমুখেই সময় কাটায়। কিন্তু এই হাসির আড়ালে জমা থাকা চাপা দীর্ঘশ্বাসটুকু কেবল ফাবিহাই জানে।
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যখন তারা অজিতের গাড়ির দিকে হাঁটছিল, ঠিক তখনই রাস্তার বিপরীত পাশের ফুটপাত দিয়ে যাওয়া এক লোকের ওপর ফাবিহার চোখ পড়ে গেল। পরনে একটা পরিচিত কালো শার্ট, কাঁধে ঝোলানো ব্যাকপ্যাক—হুবহু রাহিলের হাঁটার ভঙ্গি! ফাবিহার পা দুটো যেন মুহূর্তের জন্য মাটিতে গেঁথে গেল। সে কি সত্যিই রাহিল ছিল, নাকি তার মনের ভুল?
